ড. কাজী কামাল আহমদ
একজন মরমী কবি, সংগীতজ্ঞ ও গ্রন্থকার
লোকগীতি ও মরমী গানের একজন একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ও গবেষক
সিলেট তথা বাংলাদেশের প্রথিতযশা সুফী-সাধক-কবি ও গ্রন্থকার হযরত রকীব শাহ (রঃ) এর পুত্র ড. কাজী কামাল আহমদ একজন মরমী কবি, সংগীতজ্ঞ ও গ্রন্থকার। জন্ম সিলেটের কাজীটুলায় ২০ ডিসেম্বর, ১৯৫০। তিনি বহু গ্রন্থের লেখক, অনুবাদক ও সম্পাদক।
পেশায় একজন ব্যবসায়ী ড. কাজী কামাল আহমদ তাঁর পিতার জীবদ্দশায় প্রকাশিত তিনটি গ্রন্থ পুনঃপ্রকাশ ও পনেরোটি অপ্রকাশিত পাÐুলিপি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে সুখী ও সাহিত্যানুরাগী সমাজে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হন।
রকীব শাহ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান ও রকীব শাহ পরিষদের সভাপতি ড. কাজী কামাল আহমদ সিলেটের কাজীটুলায় হযরত রকীব শাহ (রঃ) এর প্রতিষ্ঠিত রকীব শাহ সূফী স্কুল এর পরিচালক, প্রশিক্ষক, খাদেম ও গদীনশীন। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের গায়ক ড. কাজী কামাল আহমদ লোকগীতি ও মরমী গানের একজন একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ও গবেষক।
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও তাঁর একটি মুখ্য ভ‚মিকা আছে। তিনি ২০০১ সনে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি শক্তিশালী ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ছিলেন। এছাড়া ২০০৩ ও ২০০৮ সনে সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন। ১৯৮০ ইংরেজিতে প্রথম ও ১৯৮৩ ইংরেজীতে দ্বিতীয়বার তাঁর মাতা মরমী কবি আরিজা খাতুনকে নিয়ে হজ্জব্রত পালনকারী ড. কাজী কামাল আহমদ এযাবৎ বাংলাদেশের ৪০টি জেলা ও বিশ্বের ২১টি দেশ ভ্রমণ করেন। তার গ্রন্থের সংখ্যা ১০টিরও বেশি। লেখা গ্রন্থের পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রন্থের অনুবাদ ও সম্পাদনায়ও রয়েছে তাঁর অসামান্য অবদান।
একজন মরমী কবি, সংগীতজ্ঞ ও গ্রন্থকার
তাঁর লেখা গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থের পরিচিতি নিচে তুলে ধরা হলো:
আমি তোমার দেওয়ানা
প্রথম প্রকাশ ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দ ও দ্বিতীয় প্রকাশ ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দ। ৫০টি মরমী সংগীতের সংকলনটি প্রকাশ করেছে বনবীথি প্রকাশনী। এটি ড. কাজী কামাল আহমদের প্রথম গ্রন্থ।
যশস্বী সুফি কবি রকীব শাহের উত্তরসূরী ড. কাজী কামাল আহমদের সাহিত্যের ঘরানা পিতার মতো হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তিনিও তার পিতার মতো ভাব জগতে বিচরণ করেছেন এবং এ গ্রন্থে মরমী সংগীত রচনায় পারদর্শিতার প্রমাণ দিয়েছেন।
সূফী-সাধক-কবি হযরত রকীব শাহ (রঃ)
সূফী সাধক কবি হযরত রকীব শাহ (র.)আধ্যাত্মিক ভুবনে একজন অতি উজ্জল ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন, সাধনা ও বিশাল সাহিত্য ভাÐার নিয়ে এ গ্রন্থটি লেখা হয়েছে। রকীব শাহ’র সৃষ্টিকর্মে রয়েছে প্রবন্ধ, কবিতা ও মরমী সংগীত। মরমী ধারার সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য অংশ। মরমী সংগীত ছাড়াও রকীব শাহ্ কবিতা ও প্রবন্ধ রচনায় পাÐিত্য প্রদর্শন করেছেন। তিনি যেহেতু একজন আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন তাই তাঁর সকল রচনাতেই আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া পাওয়া যায়।
এই গ্রন্থের মাধ্যমে রকীব শাহের সম্পূর্ণ জীবন, সাহিত্য, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার একটি সামগ্রিক রূপ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়।
ধর্ম ধার্মিক ধর্মান্ধ
ধর্ম হলো একটি বিশ্বাসব্যবস্থা, যা মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। ধার্মিক ব্যক্তিগণ তাদের ধর্মের মূল্যবোধ ও নীতিগুলো অনুসরণ করে জীবনযাপন করেন। ধর্মান্ধ ব্যক্তিরা অতিমাত্রায় ধর্মচর্চা করতে চান এবং অন্যদের উপর সেগুলো চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। সেটা ভুল কি শুদ্ধ তা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন মনে করেন না।
ধর্মের সঠিক শিক্ষা ও প্রচারের লক্ষ্যে এই ছোট্ট গ্রন্থটি বৃহৎ ভ‚মিকা পালনে সক্ষম।
শয়তানের পলায়ন
ইসলামে শয়তানকে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রæ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইসলামে মানুষের মুক্ত ইচ্ছার কথাও বলা হয়েছে। মানুষ নিজের ইচ্ছায় ভালো বা খারাপ কাজ করতে পারে। তাই, মানুষের শয়তানি শয়তানের প্ররোচনার ফলে ঘটলেও, মূল দায়িত্ব মানুষের নিজের উপরই বর্তায়। দার্শনিকরা শয়তানকে একজন ব্যক্তি হিসেবে নয়, একটি ধারণা বা প্রবৃত্তি হিসেবে দেখেন। তারা মানুষের মধ্যে থাকা কুপ্রবৃত্তি, আগ্রাসন, লোভ, হিংসা, বিদ্বেষ ইত্যাদিকে শয়তানের প্রতীক হিসেবে দেখেন।
গ্রন্থটিতে মানুষের শয়তানির নানা দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ ছাড়াও হাদিস এবং কোরআনের সূত্রসহ মানুষ এবং শয়তানের সম্পর্ক ও কার্যাবলি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
লালসালুদের শিংগা: বিচারদিনের অনুস্মারক
লাল রং বিপদ সংকেতে ব্যবহৃত হয়। সাবধানতা অবলম্বনের জন্য লাল রং ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন ব্যবহৃত হয় রাস্তায় বা ট্রেনের সিগনালে। সর্বত্রই লাল রং সাবধানতার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত।মাজার-মঞ্জিলে লালসালুওয়ালারাও এই সাবধানতার প্রতীক বহন করেন। তাঁদের হাতের শিংগা শেষ বিচার দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অপকর্ম থেকে নিবৃত্ত রাখতে মানবজাতির প্রতি লালসালুওয়ালাদের এই প্রচেষ্টা। অনেকে তাদেরকে বুঝে না বুঝে সমালোচনা করেন।
গ্রন্থটি পাঠের মাধ্যমে লালসালুদের শিংগা ও তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও ইতিবাচক ধারণা জন্মাবে।
ইসলাম প্রচারে মরমী সংগীতের ভ‚মিকা
বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর মধ্যে মরমী সংগীত ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। এটি এমন এক ধরনের আধ্যাত্মিক ঘরানার সংগীত; যা অন্তরাত্মাকে তৃপ্ত করে, হৃদয়ের যাতনা নিবারণ করে এবং জীবাত্মাকে পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত করে। এই সংগীত শুধু সংস্কৃতিকেই লালন করে না, বরং প্রকৃত ধর্মজ্ঞানকে সুরের মূর্ছনার মাধ্যমে তা হৃদয় থেকে হৃদয়ে বিস্তার ঘটিয়ে থাকে। বিশ্বের বড় বড় সুফি, ওলি, আউলিয়াগণ মরমী সংগীত সাধনা করেছেন। আর এই সংগীতের মাধ্যমেই তারা তাদের ধর্মপ্রচার যুগের পর যুগ ধরে চালিয়ে গিয়েছেন। এমনকি তাদের ওফাতের পর শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে গেলেও তাদের এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। তাদের রচিত মরমী সংগীত মানুষের মুখে মুখে চর্চিত হয়।
এই গ্রন্থটির মাধ্যমে ইসলাম প্রচারে মরমী সংগীতের অবদান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
মিনহাজুল আশিকীন
মিনহাজ শব্দের অর্থ হলো পথ বা রাস্তা। আশিক শব্দের অর্থ হলো প্রেমিক বা অনুরাগী। অর্থাৎ গ্রন্থটির নামের মধ্যেই এর উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। ইসলাম চর্চায় পরিপূর্ণ জ্ঞানী হতে হলে তরিকত, হকিকত হয়ে ইসলামের গভীরতম সোপান মা’রিফতে পৌঁছতে হবে। মারিফত হলো মহান আল্লাহ্ পাকের গোপন ও গুঢ় রহস্যমÐিত জগত।অন্তরে নূরের আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে আল্লাহ্ পাকের সঙ্গে গড়ে উঠা প্রেমের সম্পর্ককে মারিফত বলে। ওলি আউলিয়াগণ কঠোর সাধনার মাধ্যমে সোপান থেকে সোপানে উত্তরণ লাভ করেন এবং মা’রিফত মঞ্জিলে পৌঁছে আউলিয়ায় কামিলীন হয়ে যান। যা গ্রন্থটির মাধ্যমে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
তাই গ্রন্থটি অনুরাগীদের খাস পথের দিশা পেতে এবং চলতে সাহায্য করবে।
মোমবাতি কবরের আলো
ধর্মীয় উপাসনার কাজে মোমবাতির ব্যবহার একটি প্রাচীন পদ্ধতি। তাই এর তাৎপর্য অনেক। প্রায় সকল প্রধান ধর্মেই মোমবাতির ব্যবহার লক্ষণীয়। মোমবাতি আলো, আশা, আধ্যাত্মিকতা ও পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। মোমবাতি শুধু আলোকসজ্জায় নয়, বরং এটি বিভিন্ন ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বস্তু।
মোমবাতি কীভাবে ধর্মীয় আলোর প্রতীক হিসেবে প্রতীয়মান হয় তার একটি সুবিস্তৃত বর্ণনা এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত করা হয়েছে।
সুফিবাদ ইসলামের নির্যাস
ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়, এটি একটি জীবনব্যবস্থা। মানুষ ধ্যান-ধারণা ও সাধনার মাধ্যমে ইসলামের গভীরে প্রবেশ করে এর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য অনুধাবন করতে পারে।এটি এমন এক আধ্যাত্মিক অনুশীলন, যা বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার সীমা ছাড়িয়ে অন্তরের শুদ্ধি, প্রেম, এবং আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের পথে মানুষকে আহŸান করে। কোরআনের আয়াত ও রাসূল (সা.)-এর জীবনচর্চায় যে গভীর প্রেম, বিনয়, এবং আত্মসমর্পণের শিক্ষা রয়েছে, সুফিবাদ সেই শিক্ষারই অন্তরঙ্গ ব্যাখ্যা।
এই গ্রন্থ পাঠকের হৃদয়ে একটি আলো জ্বালাবে, যে আলো কোন বাহ্যিকতা নয়, বরং অন্তরের গভীর থেকে উৎসারিত হবে।
অনুবাদ ও সম্পাদিত গ্রন্থ
বিনয় করে কাতর সুরে (ইংরেজি অনুবাদ)
‘বিনয় করে কাতর সুরে’ আরিজা খাতুনের একটি আধ্যাত্মিক ঘরানার সুফি সংগীত গ্রন্থ। এটির মূল বই সর্বপ্রথম ১৯৯৬ সালে বনবীথি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। ১৫টি সংগীত সম্বলিত তাপসী আরিজা খাতুনের লেখা এই বইটির ইংরেজি অনুবাদ করেন তাঁরই পুত্র ড. কাজী কামাল আহমদ। যা একই প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় ২০২১ সালে।
মরমী কবি আরিজা খাতুন (সংকলন)
২০২১ সালে বনবীথি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই সংকলনটি তাপসী আরিজা খাতুনের উদ্দেশ্যে একটি স্মারক গ্রন্থ হিসেবে সংকলিত হয়। যেটি সম্পাদনা করেন ড. কাজী কামাল আহমদ। তিনি ছাড়াও এতে বিখ্যাত ও সুধিজনের লেখা স্থান পেয়েছে। যারা লিখেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন- দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, ড. খোন্দকার রিয়াজুল হক, জামিল আহমদ চৌধুরী, বোরহান উদ্দিন খান, সৈয়দ মোস্তফা কামাল, সৈয়দা আঁখি হক, রেজিন খান প্রমুখ।